Showing posts with label কলোরাডো. Show all posts
Showing posts with label কলোরাডো. Show all posts

2016/05/08

নগরে নিসর্গ / ২

॥এক॥

মেঘবতীদের ভেজা চুল যখন জলের ভারে ভরে ওঠে, সে চুল শুকাতে তখন তারা নেমে আসে রকি মাউন্টেনের উপর। একসাথে তারা মেলে দেয় তাদের চুল, দূর থেকে মনে হয় যেন মায়ের শাড়ির জবুথবু আঁচল--এখনই ঝরঝর করে নেমে আসবে শ্রাবণ-ধারার মতো।

তারপর বৃষ্টি নামে। তার সাথে চলে সুর্যের লুকোচুরি। এই রোদ, এই বৃষ্টি--বৃষ্টির সাথে রোদ, রোদের সাথে বৃষ্টি।

ক্যামেরাটা সাথে নেই বলে দু:খ বোধ হয় হয়তো। পরক্ষণেই বৃষ্টির কথা চিন্তা করে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বরং আফসোস হয় চিত্রকর হইনি বলে। নয়তো ক্যানভাস মেলে ধরে পশ্চিমমমুখী রাস্তাটার ধারে বসে যেতাম তখনই। যতবার দেখি ততবার সেই অনুভূতি--ছবিটা যদি ফ্রেমে বাঁধা যেতো!

ছবিটি তোলা হয়না বলে একদিক থেকে ভালোই হয়--কিছু একটা লেখার অনুসঙ্গ পাওয়া যায়।

A view of the Rocky Mountain Arsenal National Wildlife Refuge, Colorado

॥ দুই॥

নগরে বসন্ত এসেছে। আর তার ছোঁয়া লেগেছে রাস্তার পাশে জীর্ণ ঘাসে, গাছের শীর্ণ শাখায়, পার্কের লেইকে, বুনো হাঁসের পালকে। কানাডা গুজ-এর বাচ্চারা পেয়েছে নতুন ডানা--তারা উড়ছে সকাল ও সন্ধ্যার আকাশে। আজ নতুন প্রাণের ছোঁয়া লেগেছে ফুরফুরে ঘাসের ফুলে, বুনো ড্যানডেলিওনে, আর নি:সঙ্গ পর্বতে।

এখানে বসন্তে বৃষ্টি নামে যখন তখন। কখনো টিপ টিপানি আবার কখনো কালবৈশাখি। বাড়ির পিছনে বিরাট খামারবাড়ি। রাস্তা থেকে দেখা যায় সেখানের সবুজ ঘাসের মাঠ, দূরে রকি মাউন্টেনের রোদ মাখানো চূড়া। খামারে ঘোড়া আছে, গরু আছে, আছে খচ্চর। সেদিন ভর দুপুরে দেখি সবগুলো ঘোড়া একজায়গায় জড়ো হয়েছে। অনতিদূরে গরুগুলো জটলা করে ছিল--মা গরু, বাবা গরু, বাচ্চা গরু, তার মাঝে দুটো খচ্চর।

বসন্তে মানুষ বের হয়েছে ঘরের বাইরে। হাঁটছে, দৌড়াচ্ছে পার্কে; যোগাসনে বসে আছে কেউ কেউ। পার্কের বেঞ্চগুলো ঝকঝক করছে। বয়স্করা সেখানে বসে জিরোচ্ছে। কেউবা নতুন ঘাসের ঘ্রাণ পেতে শরীর মেলে দিয়েছে বিকেলের নরম রোদে। মাঝখানে পাতাঝরা গাছ দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে।

Spring is here, and signs are there

॥ তিন ॥

দাসের জীবন হলেও তা নিজেরই বেছে নেয়া। মুক্ত দাসের মতো; কাজের দাস। কখনো সময় হলে, কখনো সময় করে-- বেরিয়ে পড়া যতটা মনে হয় ততটা কঠিন নয়।

সেমিস্টার শেষ, তাই ফরমায়েসি কাজের চাপ নেই। তবে নিজের টেনে নেয়া বোঝা মাথার উপর যথেষ্ট ভার সৃষ্টি করে রেখেছে।  প্রকৃতি এখন সাজবে; এখন সাজার সময়--এই বোঝা মাঝে মাঝে মাথা থেকে নামিয়ে রেখে একটুখানি বৈরাগি সাজতে ইচ্ছে করে। যাব যাব করে একদিন চলে যাই বার লেইকে (Barr Lake)।

বার লেইক প্রাকৃতিক লেইক নয়--মানুষের বানানো। সেখানে প্রমোদতরী নামানোর ব্যবস্থা আছে। আছে ঈগলের বাসা হরেক রকমের পাখি, কায়োট (Coyote), আর বুনো শিয়াল। ভর দুপুরে বন্য প্রাণির দেখা মিলবেনা। তাই ইতিউতি ঘোরাঘুরি শেষে লম্বা ঘাসের বন পেরিয়ে দক্ষিণে যেতেই দেখি বন্যার পানির মতো পানি উঠে এসেছে ডাঙ্গায়। সেখানে কতক পুরনো মরা গাছের গুড়ি ভাসছে। এদিক ওদিক যেদিকে তাকাই সবকিছু দেখা যায়। কদিন পরে এই শুকনো মরা ঘাসের বন মেতে উঠবে প্রাণের ছোঁয়ায়, লাল-ডানা কালো পাখি (Red winged Blackbird) নেচে বেড়াবে শাখা থেকে শাখায়।

হঠাৎ সাপে-ধরা ব্যাঙের আর্তচিৎকারের মতো শোনা গেল। সাবধানে ঘাসের বন ছেড়ে বোর্ডওয়াকে উঠে পড়ি। তারপর উত্তরে তাকাতেই দেখি পাতাহীন গাছগুলো এক সারিতে দাঁড়িয়ে আছে কারো প্রতীক্ষায়। উপরে নীল আকাশ, লেইকের পানিতে তার স্বচ্ছ প্রতিবম্ব সৃষ্টি করেছে এক অদ্ভুত দৃশ্যের। এ দৃশ্য ধারণ করার জন্য নয়, কেবল দৃষ্টি দিয়ে উপভোগ করার জন্য।

Barr Lake State Park

2015/10/18

অক্টোবর শেষ হতে চলছে, এখনো শীতের দেখা নেই

না, এর মানে এই নয় যে আমি চাইছি এখনি শীত নামুক।

চেনা জানা পরিসরে সবাই বলাবলি করছে গতবার নাকি এই সময় ডেনভারে শীত নেমে গিয়েছিল। এবার সামারের আমেজ যেন শেষই হচ্ছে না। ব্যাপারটা খারাপ নয়। সত্যি কথা বলতে কি, কয়জনই বা শীত পছন্দ করে!

আমাদের বাসার সামনে দু্টি গাছ--নাম জানিনা। পাতাগুলো দেখতে অনেকটা সংসদভবনে মানিক মিয়া এভিডিউর পাশ দিয়ে সারিবেঁধে লাগানো বেলি ফুলের পাতার মতো। গাছটা ততটা ঝাঁকড়া নয় যদিও। বরং অনেকটা লম্বাটে। দুরে থেকে কেউ ম্যাপল বলে ভুল করবে হয়তো। গাছ দুটির একটির পাতা হলুদ হওয়া শুরু করেছে। উপরের দিক থেকে প্রায় হলুদ, হলুদ থেকে কমলা রঙ ধারণ করেছে। নিচের দিকে খানিকটা সবুজ এখনো রয়েছে। আরেকটির পাতা ঝরে পড়ছে ধীরে ধীরে। সেটিতে পাতাগুলো ছাড়া-ছাড়া-ভাবে হলুদ হয়েছে। একটি হলুদ, একটি সবুজ, আবার একটি হলুদ একটু সবুজ।

সারাদিন ঝকঝকে রোদ ছিল। বিকেল ৫টার দিকে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব আকাশ কালো করে মেঘ করেছে। মনে হচ্ছে এক পশলা বৃষ্টি হবে। পশ্চিমে রকি মাউন্টেনের উপর মেঘেরা ওড়াউড়ি করছে। দুর থেকে মনে হচ্ছে যেন ঘোঁয়া আর ধোঁয়া।

বাসার সামনে জানালা দিয়ে দেখছি ডান দিকের গাছটি একটু একটু কাঁপছে। নাহ, বৃষ্টি বোধ হয় নেমেই পড়ল।

যাই, জানালা গুলো সব বন্ধ করতে হবে।

জানালার কাছে গিয়েই ভুল ভাংলো। বৃষ্টি পড়ছেনা। তবে পড়ি পড়ি করছে।



2015/01/20

পড়ন্ত বিকেলে বন্যপ্রাণির অভয়ারণ্যে

A view of the Rocky Mountain Arsenal National Wildlife Refuge, Colorado

উপরে মেঘের আনাগোনা, নীচে হলুদ প্রেইরী, পাশে একটি সবুজ বন। একদল খয়েরি হরিণ সেখানে জটল করেছিল। আর অস্তমিত সূর্যের রশ্মি আলোক রেখা ছড়িয়ে দিয়েছিল এখানে সেখানে। উপরে জটলা পাকানো মেঘেরা অপেক্ষা ছিলো এক ঘূর্ণির বায়ুর। মুহূর্তগুলো কখনোই হারায়না; শুধু আস্তরের উপর আস্তর পড়ে মাত্র।

ছবি: রকি মাউন্টেন ন্যাশনাল ওয়াইল্ড লাইফ রেফিউজ, কলোরাডো, আমেরিকা।
ক্যামেরা: ক্যানন ৬ডি + ৭০-২০০মিমি এফ২.৮ আইএস ইউএসএম @১০৫মিমি, আইএসও ১০০, ১/২০০, এফ/৪

2014/10/03

নগরে নিসর্গ

। এক ।

মধ্য দুপুরে জানালায় ভারী পর্দা দিয়ে অন্ধকার ঘরে দিবাস্বপ্ন দেখতে দেখতে যখন দিবানিদ্রায় যাওয়ার সময় হল ঠিক তখনই খুব কাছে থেকে একটা ঘুঘু ডেকে উঠল। একবার, দুইবার। এর পর থেমে থেমে আরো কয়েকবার।

তন্দ্রা মতো ধরেছিল। ঘুঘুর ডাকে তন্দ্রার মধ্যেই স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হল। আমি কোথায়? কোথায় আমি? তিরিশ বছর আগের কোন এক দুপুরে ঘরের দরোজা খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিল যে কিশোরটি--এপাশ থেকে ওপাশ ফিরে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে সেই খোলা দরোজা দিয়ে দেখেছিল লাল-মরিচে ভরা বাড়ির আঙিনায় রৌদ্রের মেলা, আজ বহুদিন পরে ঘুঘুর ডাক যেন নিয়ে গেল সেই কৈশোরে!

ভর দুপুরে ক্লান্ত পথিকের মতোই অলস স্বরে ডাকছিল সেই ঘুঘু। অনেকক্ষণ সেই ডাক না শুনে তন্দ্রা ছুটে গেলে নিজেকে আবিষ্কার করি কাগজের তৈরী ঘরে পাতা অস্হায়ী বিছানায়। কী অদ্ভুত জীবন্ত সেই স্মৃতি! স্মৃতির সেই অযুত-নিযুত গলি পথের দিশা খুঁজতেই আবারো তন্দ্রা এলো, সেই সাথে ফিরে এল অগণিত স্মৃতি যেন একটানে দেখে ফেলা বায়োস্কোপের সুদীর্ঘ রীল-- স্টেশনে দাঁড়িয়ে সদ্য মিস করা ট্রেনের যাত্রীর মতো অপলক দৃষ্টি হারায় যার শেষ বিন্দুটুকু।

। দুই ।

এখন কয়টা বাজে?
ঘড়ি দেখবার সামর্থ্য উধাও।

হয়তো মধ্যরাতের একটু পর। দরোজার ওপাশে পার্কিং লট। মাঝখানে কংক্রিটের ওয়াকওয়ে।  কংক্রিটের উপর টপ টপ শব্দ করে  বৃষ্টি পড়ছে। এরই মধ্যে কোত্থেকে আদুরে গলায় কাকের বাচ্চার মতো ডাক শোনা গেল। নিশ্চয়ই সেই ঘুঘু উপরের কোন ঘুলঘুলিতে বাসা বেঁধেছে। আশেপাশে কোন কাকের দেখা মেলেনি কোনদিন। অথচ কাক দেখা যায় রকি পর্বতমালায়--১০ হাজার ফুট উপরে-- আলপাইন তুন্দ্রায়।

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ঘর পেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াই। সামনে একইভাবে খানিকটা বাঁকা করে পার্ক করা পুরনো সেই গাড়ি, তার ওপাশে আবার দালান, দালানের উপর আকাশ, আকাশে ইতস্তত মেঘ অলস গতিতে সময় কাটাচ্ছে। আধা একটা চাঁদ উঠেছে--কালো আকাশে অন্যের আলোয় নিজেকে সাজিয়েছে--যেন আমার জন্যই তার অপেক্ষা।

।তিন।

অক্টোবরে চলে এলো। শীতও আসি আসি করছে। আজ সকালে ধূমায়িত মেঘ যখন নেমে এসেছিল স্কুলের মাঠে, সূর্য তখন প্রাণান্ত চেষ্টা করছিল সেই আবরণ ছিঁড়ে ফেলতে। রকির চূড়ায় জমতে শুরু করেছে শাদা বরফ -- এভিনিউ ১২০ থেকে দেখে মনে হয় যেন তিমির পিঠে জমানো ফেনা। উপরে নিশ্চল নিশ্চুপ মেঘের দল ভীর করে আছে, আর নীচে নীলচে রকি মাউন্টেন সৃষ্টি করেছে এক অদ্ভুত কালার কম্বিনেশন। চোখের দেখা আর ক্যামেরায় দেখা এক নয়। তাই ক্যামেরা ও চোখ রয়ে যায় যার যার স্থানে।