আমেরিকা-আমেরিকা-আমেরিকা। আমার এবং আমার চারপাশের অনেকের জীবনেই আমেরিকা এমন একটা স্থান দখল করে নিয়ে আছে যেটা উপেক্ষা করা যায়না। একবার এক বন্ধু বলছিল দেশে থাকতেও আমরা ভারতের দিকে মুখ করে থাকতাম, আর বিদেশে (কানাডায়) এসেও সেই একই অবস্থা; ভারতের বদলে কেবল আমেরিকা। বন্ধুটি সম্ভবত দূরদর্শনের ভূত থেকে শুরু করে কোরবানীর ভারতীয় গরুর প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছিল। অবস্থার পরিবর্তন কেবল সময়ের স্কেলে--হরহামেশাই বন্ধুটি নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর জন্য আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। চার লিটার দুধ এখানে সাড়ে পাঁচ ডলার আর ওপারে আড়াই ডলার। অবিশ্বাস্য, কিন্তু সত্যি। তাই দুধ, আর নিত্যপ্রয়োজনীয় গ্রোসারি থেকে শুরু করে বন্ধুটি প্রায়ই আমেরিকা থেকে বাক্স-বাক্স চিকেন কিনে আনে। ওখানে নাকি অনেক সস্তা।
দেশের কাউকে যখন বলি আমরা থাকি কানাডার অমুক শহরে, যার পাশ দিয়ে ডেট্রয়েট নদী আর ওপারেই আমেরিকা। বাসা থেকে দুই মিনিট হাঁটলেই নদীর পাড়ে গিয়ে আমেরিকা দেখা যায়। গল্পে গল্পে আমেরিকা দখল করে নেয় কানাডার স্থান। সম্ভবত বক্তা এবং শ্রোতা উভয়েরই আমেরিকার প্রতি এক অনিবার্য মোহ রয়েছে, আর সে কারণেই বারবার গল্পে, আড্ডায়, জীবন-যাপনে উঠে আসে আমেরিকার প্রসঙ্গ।

আম্মা-আব্বা যেবার এখানে বেড়াতে এলেন, মনে আছে এয়ারপোর্ট থেকে প্রথমেই যেখানে নিয়ে গিয়েছিলাম সেটা ডেট্রয়েট নদীর পাড়। তখন সবে সন্ধ্যা নেমেছে। ডেট্রয়েট নদীর উপর এ্যাম্বাসাডর ব্রিজের নীচে তখন সারি সারি আলোর নাচন। আর সেই দোলায় দুলছে নদীর ঢেউগুলো। বলা বাহুল্য, আম্মার মুখ দিয়ে দ্বিতীয় যে বাক্যটি বের হয়েছিল, তা ছিল আমেরিকা নিয়ে--"আমেরিকার এত কাছে!"
সেই আমেরিকা নিয়েই এই লেখার চিন্তা মাথায় এল। গত কয়দিন থেকে কী লিখবো আর কিভাবে লিখব শুধু সেটাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে কোথায় থেকে শুরু করবো তা ঠিক করতে পারিনি। বর্ডার ক্রসিং দিয়েই শুরু করি।
বর্ডার ক্রসিং
ইউএস বর্ডার পার হতে গিয়ে যতটা আতঙ্ক আর অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছি তার সাথে সম্তবত বিসিএস পরীক্ষার ভাইভারও তুলনা চলে না। নটর ডেম কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় টেকার পরে একটা ভাইভা দিতে হোত। এখন কি সিস্টেম জানিনা, এত এত জিপিএ পাঁচ দেয়ে আবার ভাইভা নিয়ে কী করবে! আমি ভাইভা দিতে গিয়ে দেখি এক ছেলে এসেছে তার মায়ের সাথে। ছেলেটি ভাইভার টেনশনে দরদর করে ঘামছে আর সমানে বিড়বিড় করছে। সম্ভবত যত দোয়া-কালাম জানে সেটাই পড়ছিল। এই হল ভাইভার টেনশন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল নটরডেমের ভাইভা নিছক ফর্মালিটি--কাউকে কখনোই বাদ দেয়না। পরে জেনেছিলাম ভাইভাতেও অনেককেই বাদ দেয়। কাছের এক বন্ধুর জীবনেই সেই দুর্ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েছিল।

যা বলছিলাম-- বর্ডার ক্রসিং। বাংলাদেশে জন্মাবার অপরাধে ইউএস বর্ডার পার হওয়ার সময় আমাদের যেতে হতো বিশেষ একটা রেজিস্ট্রেশনের মধ্যে দিয়ে। এর নাম এনসিয়ারস-- ন্যাশনাল সিকিউরিটি এন্ট্রি-এক্সিট রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম। সেই প্রসঙ্গে আসছি, তবে তার আগে বলে রাখি আমাদের এখান থেকে দুই ভাবে ইউএস যাওয়া যায়: ব্রিজ দিয়ে অথবা ডেট্রয়েট নদীর তলদেশ দিয়ে করা টানেল দিয়ে। কোন এক অজানা কারণে নদীর তলদেশ দিয়ে যাওয়ার চেয়ে খোলা আকাশের নীচে দিয়ে যাওয়া নিরাপদ মনে হোত। তাছাড়া ব্রিজ একেবারে ঢিল ছোঁড়ার দূরত্বে (কথার কথা আরকি), এক টানেই চলে যাওয়া যায়।
কানাডা-আমেরিকার বর্ডার বলা যায় অর্ধেক খোলা। অর্থাৎ কানাডা থেকে আমেরিকায় ঢোকার সময় ব্রিজে উঠে পড়লেই আপনি কানাডার বাইরে চলে গেলেন। ব্রিজের ওপারে গিয়ে ইউএস কাস্টমস-এর বুথ। তেমনি ইউএসএ থেকে কানাডায় আসার সময় ওপারে কোন চেকপোস্ট পার হতে হয় না, সরাসরি কানাডিয়ান কাস্টমস এর চেক পোস্টে হাজির হতে হয়। ব্যাপরটা যে এরকম সেটা প্রথম যেদিন আমেরিকা যাই সেদিন বুঝতে পারি। ধারনা ছিল কানাডার বাইরে যাওয়ার সময় কানাডিয়ান কাস্টমস পার হতে হবে। তাই অবাক হই যখন বিনা বাধায় কানাডা থেকে বের হয়ে ব্রিজের উপরে উঠে পড়ি। ব্রিজের উপর কিংবা টানেলের ভিতর কোন অবস্থাতেই ইউ টার্ন নেয়া সম্ভব নয়। এখানে প্রকাশ্যে ও গোপনে ক্যামেরার নজরদারি চলে ২৪/৭।
চলবে।
দেশের কাউকে যখন বলি আমরা থাকি কানাডার অমুক শহরে, যার পাশ দিয়ে ডেট্রয়েট নদী আর ওপারেই আমেরিকা। বাসা থেকে দুই মিনিট হাঁটলেই নদীর পাড়ে গিয়ে আমেরিকা দেখা যায়। গল্পে গল্পে আমেরিকা দখল করে নেয় কানাডার স্থান। সম্ভবত বক্তা এবং শ্রোতা উভয়েরই আমেরিকার প্রতি এক অনিবার্য মোহ রয়েছে, আর সে কারণেই বারবার গল্পে, আড্ডায়, জীবন-যাপনে উঠে আসে আমেরিকার প্রসঙ্গ।
আম্মা-আব্বা যেবার এখানে বেড়াতে এলেন, মনে আছে এয়ারপোর্ট থেকে প্রথমেই যেখানে নিয়ে গিয়েছিলাম সেটা ডেট্রয়েট নদীর পাড়। তখন সবে সন্ধ্যা নেমেছে। ডেট্রয়েট নদীর উপর এ্যাম্বাসাডর ব্রিজের নীচে তখন সারি সারি আলোর নাচন। আর সেই দোলায় দুলছে নদীর ঢেউগুলো। বলা বাহুল্য, আম্মার মুখ দিয়ে দ্বিতীয় যে বাক্যটি বের হয়েছিল, তা ছিল আমেরিকা নিয়ে--"আমেরিকার এত কাছে!"
সেই আমেরিকা নিয়েই এই লেখার চিন্তা মাথায় এল। গত কয়দিন থেকে কী লিখবো আর কিভাবে লিখব শুধু সেটাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে কোথায় থেকে শুরু করবো তা ঠিক করতে পারিনি। বর্ডার ক্রসিং দিয়েই শুরু করি।
বর্ডার ক্রসিং
ইউএস বর্ডার পার হতে গিয়ে যতটা আতঙ্ক আর অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছি তার সাথে সম্তবত বিসিএস পরীক্ষার ভাইভারও তুলনা চলে না। নটর ডেম কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় টেকার পরে একটা ভাইভা দিতে হোত। এখন কি সিস্টেম জানিনা, এত এত জিপিএ পাঁচ দেয়ে আবার ভাইভা নিয়ে কী করবে! আমি ভাইভা দিতে গিয়ে দেখি এক ছেলে এসেছে তার মায়ের সাথে। ছেলেটি ভাইভার টেনশনে দরদর করে ঘামছে আর সমানে বিড়বিড় করছে। সম্ভবত যত দোয়া-কালাম জানে সেটাই পড়ছিল। এই হল ভাইভার টেনশন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল নটরডেমের ভাইভা নিছক ফর্মালিটি--কাউকে কখনোই বাদ দেয়না। পরে জেনেছিলাম ভাইভাতেও অনেককেই বাদ দেয়। কাছের এক বন্ধুর জীবনেই সেই দুর্ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েছিল।
যা বলছিলাম-- বর্ডার ক্রসিং। বাংলাদেশে জন্মাবার অপরাধে ইউএস বর্ডার পার হওয়ার সময় আমাদের যেতে হতো বিশেষ একটা রেজিস্ট্রেশনের মধ্যে দিয়ে। এর নাম এনসিয়ারস-- ন্যাশনাল সিকিউরিটি এন্ট্রি-এক্সিট রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম। সেই প্রসঙ্গে আসছি, তবে তার আগে বলে রাখি আমাদের এখান থেকে দুই ভাবে ইউএস যাওয়া যায়: ব্রিজ দিয়ে অথবা ডেট্রয়েট নদীর তলদেশ দিয়ে করা টানেল দিয়ে। কোন এক অজানা কারণে নদীর তলদেশ দিয়ে যাওয়ার চেয়ে খোলা আকাশের নীচে দিয়ে যাওয়া নিরাপদ মনে হোত। তাছাড়া ব্রিজ একেবারে ঢিল ছোঁড়ার দূরত্বে (কথার কথা আরকি), এক টানেই চলে যাওয়া যায়।
কানাডা-আমেরিকার বর্ডার বলা যায় অর্ধেক খোলা। অর্থাৎ কানাডা থেকে আমেরিকায় ঢোকার সময় ব্রিজে উঠে পড়লেই আপনি কানাডার বাইরে চলে গেলেন। ব্রিজের ওপারে গিয়ে ইউএস কাস্টমস-এর বুথ। তেমনি ইউএসএ থেকে কানাডায় আসার সময় ওপারে কোন চেকপোস্ট পার হতে হয় না, সরাসরি কানাডিয়ান কাস্টমস এর চেক পোস্টে হাজির হতে হয়। ব্যাপরটা যে এরকম সেটা প্রথম যেদিন আমেরিকা যাই সেদিন বুঝতে পারি। ধারনা ছিল কানাডার বাইরে যাওয়ার সময় কানাডিয়ান কাস্টমস পার হতে হবে। তাই অবাক হই যখন বিনা বাধায় কানাডা থেকে বের হয়ে ব্রিজের উপরে উঠে পড়ি। ব্রিজের উপর কিংবা টানেলের ভিতর কোন অবস্থাতেই ইউ টার্ন নেয়া সম্ভব নয়। এখানে প্রকাশ্যে ও গোপনে ক্যামেরার নজরদারি চলে ২৪/৭।
চলবে।